৬ অধ্যায় ৬
দুর্গটিতে শস্য পিষবার জন্য যাঁতা রয়েছে। এখানকার মানুষেরা সচরাচর গোটা গম রান্না করে খায় না, কারণ তা হজম করা কঠিন। এছাড়া রান্না করা গম বেশিক্ষণ সংরক্ষণও করা যায় না, তাই বাইরে কোথাও যাওয়ার সময় তা শুকনা খাবার হিসেবেও নেওয়া যায় না। সেজন্য মানুষ সাধারণত গম পিষে ময়দা তৈরি করে এবং তা দিয়ে রুটি সেঁকে নেয়। একবার রুটি সেঁকে নিলে তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে দশ-পনেরো দিন অনায়াসেই চলে যায়, বারবার উনুন জ্বালানোর ঝামেলা থাকে না।
এই পৃথিবীতে রুটি অন্যতম প্রধান খাদ্য। এমনকি রাজার খাবার টেবিলেও রুটির উপস্থিতি অনিবার্য।
টোফু বা সয়াবিনের পনির তৈরি করতে হলে ডাল আগে থেকে ভিজিয়ে রাখতে হয়। দুপুরের খাবারের জন্য এখন তা সম্ভব নয়। ওয়েন লিউ তাই বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ককে বললেন অর্ধেক ডাল কূপের পানিতে ভিজিয়ে রাখতে, যাতে সন্ধ্যায় তা পিষে নেওয়া যায়। বাকি অর্ধেক ডাল একটি বড় মাটির পাত্রে টুকরো করা শূকরের হাড়ের সাথে সেদ্ধ হতে দেওয়া হলো।
ওয়েন লিউ তাতে কিছু শুকনো আদার টুকরোও দিয়ে দিলেন, যাতে আঁশটে গন্ধ দূর হয় এবং স্বাদ বাড়ে। বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন যেন ওয়েন লিউ কোনো অপচয়কারী। তার মতে, হাড় ও ডালের এই ঝোল তো দাসদের জন্য, আর আদা একটি দামী মশলা যা কেবল প্রভু ওয়েন লিউয়ের জন্যই বরাদ্দ। দাসদের কেন এসব খাওয়ানো হবে?
মাত্র একদিনের পরিচয়েই বৃদ্ধ উইলিয়াম বুঝতে পেরেছেন তার এই নতুন প্রভুর স্বভাব কিছুটা অন্যরকম। দাসদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ অভিজাতদের মতো নয়। কোনো অভিজাতই শিকার পাওয়ার পর সবার আগে দাসদের মাংসের স্বাদের কথা চিন্তা করেন না।
ব্ল্যাক ড্রাগন দুর্গটি দরিদ্র হওয়ায় এখানে মশলার প্রাচুর্য নেই। যা আছে তার সবই সস্তা ও সাধারণ—যেমন শুকনো আদা, পেঁয়াজপাতা, দারুচিনি ইত্যাদি। গোলমরিচও যে নেই তা নয়, তবে তা খুবই সামান্য। প্রভু কোনো বড় ভোজের আয়োজন না করলে রাঁধুনিরা খাবারে গোলমরিচ ব্যবহারের সাহসই পান না। শোনা যায়, গোলমরিচ গাছে বিষাক্ত সাপ পাহারা দেয়, কেবল এলফদের ড্রুইডরাই সেই গাছ থেকে নিরাপদে গোলমরিচ সংগ্রহ করতে পারে। মানুষের রাজ্যে ব্যবহৃত বেশিরভাগ মশলাই এলফদের রাজ্য থেকে বাণিজ্য করে আনা হয়।
ওয়েন লিউ ভাণ্ডার থেকে ফিরে দেখলেন, রাঁধুনি ও ষাঁড়-মানুষেরা মিলে বুনো শূকরটিকে পুরোটা কেটে ফেলেছে। তারা তখন খাওয়ার অযোগ্য অন্ত্র ও অন্যান্য নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করছিল।
"থামো, এই নাড়িভুঁড়িগুলো ফেলো না," ওয়েন লিউ বাধা দিলেন। "এগুলো পানি দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করো।"
"প্রভু, এই নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করার কি কোনো প্রয়োজন আছে?" বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক জিজ্ঞাসা না করে পারলেন না। অন্যরা অবাক হলেও প্রভুর সামনে কথা বলার সাহস পেল না, কেবল কান খাড়া করে রইল।
"অবশ্যই, এগুলো খাবার উপযোগী," ওয়েন লিউ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন। "আমাদের ভূখণ্ডে এত মানুষ না খেয়ে আছে, এভাবে খাবার নষ্ট করা কি ঠিক?"
বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক কাঠের গামলায় বর্জ্যের সাথে মিশে থাকা নাড়িভুঁড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ঘিনঘিন করে উঠলেন। কয়েক দশক বেঁচে থেকেও তিনি কখনো শোনেননি যে এসব খাওয়া যায়। এমনকি দাসরাও এসব নোংরা জিনিস খাওয়ার কথা ভাবে না, কারণ অপরিষ্কার খাবার খেলে অসুখ হয়, আর অসুখ মানেই মৃত্যু।
"প্রভু, এসব খাওয়া যায় না," তত্ত্বাবধায়ক তাকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করলেন। যদি খেয়ে কোনো বিপদ হয়, তবে রাজদরবারে কী জবাব দেবেন? তিনি তো জানেন, এই তরুণ প্রভু সাধারণ কোনো অভিজাত নন, তিনি উইনস্টার রাজ্যের একজন রাজপুত্র।
"আমি বলছি যাবে, নিশ্চিন্ত থাকুন। ভালো করে পরিষ্কার করে বেশি তাপে রান্না করলে কোনো সমস্যা হবে না।" এভাবে পরিষ্কার করা নাড়িভুঁড়ি শিকার করা পশুর কাঁচা রক্ত পান করার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।
রান্নাঘরে নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কারের বিশেষ কোনো সরঞ্জাম নেই। তবে ছাই দিয়ে দাগ দূর করা যায়। একমাত্র অসুবিধা হলো, এতে নাড়িভুঁড়িগুলো কিছুটা কালো হয়ে যায়। ছাইয়ের জীবাণুনাশক গুণও আছে, তাই পরিষ্কার করতে পারলেই হলো, ওয়েন লিউ এতে খুব একটা চিন্তিত নন।
ওয়েন লিউয়ের সিদ্ধান্তে বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক আর আপত্তি করতে পারলেন না। রাঁধুনি ও ষাঁড়-মানুষেরা মিলে নাড়িভুঁড়িগুলো বেছে নিল, ভেতর থেকে ময়লা বের করে কূপের পানিতে ধুয়ে নিল। এরপর ছাই দিয়ে ঘষে ঘষে কয়েকবার ধোয়ার পর সেগুলো পরিষ্কার হলো।
দুর্গে লোহার কড়াই নেই। যদিও শুধু পানিতে সেদ্ধ মাংস দাসদের কাছে পরম তৃপ্তির, কিন্তু ওয়েন লিউয়ের কাছে তা যথেষ্ট নয়। বুনো শূকর দিয়ে রাজকীয় ভোজ সম্ভব না হলেও নিজের রুচি অনুযায়ী কিছু একটা তো করা যায়।
ষাঁড়-মানুষের শক্তি বেশি, ওয়েন লিউ তাকে দিয়ে অর্ধেক মাংস কুচি করিয়ে নিলেন। রাঁধুনিকে বললেন বাকি গম পিষে ময়দা তৈরি করতে। তত্ত্বাবধায়ক কিছু বলার আগেই ওয়েন লিউ বললেন, "চিন্তা করবেন না, এই ময়দা আমার নিজের খাওয়ার জন্য।"
"আচ্ছা, সকালে সবজির ঝোল দেখেছিলাম, আমাদের কি কোনো সবজির বাগান আছে?"
"আছে, প্রভু। আপনি কি দুপুরে সবজির ঝোল খেতে চান?" অথচ সকালে ওয়েন লিউ সেই ঝোল সামান্যই খেয়েছিলেন।
"কিছু সবজি তুলে আনো, সবজির মাংসের পিঠা তৈরি করা যাবে।" শুকনো রুটি খেয়ে খেয়ে ওয়েন লিউয়ের অরুচি ধরে গেছে। মাংস যখন আছেই, তখন কিছু ভালো খাবার তৈরি করে রাখা ভালো। যদিও এই আবহাওয়ায় মাংস বেশিক্ষণ রাখা যাবে না, তবুও আগামী দুই-তিন দিন তার খাবারের চিন্তা থাকবে না।
বাগানের দিকে যাওয়ার সময় তিনি ভাবলেন, বাগানে আর কী কী সবজি আছে তা দেখে আসা দরকার। বাগানটি রান্নাঘরের কাছেই, সম্ভবত পুরনো দুর্গের বাগানের জায়গায় এটি তৈরি করা হয়েছে। বাইরের চাষাবাদের মতোই এখানে কোনো সারি নেই, সমতল জমিতে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও সবজি ঘন হয়ে জন্মেছে, কোথাও বা ফাঁকা। তবে বাইরের তুলনায় এখানে আগাছা কম, বোঝা যায় নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয়।
কিন্তু সবজিগুলোর অবস্থা ভালো নয়, পুষ্টির অভাবে ছোট হয়ে আছে। অনেক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে গেছে, আবার অনেক পাতায় ছোট প্রাণীর কামড়ের দাগ। সবজির ধরনও খুব একটা বেশি নয়। সকালে খাওয়া বাঁধাকপিও এখানে দেখা গেল, তবে তা আমাদের পরিচিত বাঁধাকপির মতো নয়, পাতাগুলো ছড়ানো। আর আছে গাজর। এখানকার মানুষেরা গাজর খায় না, কারণ মাটির উর্বরতা কম হওয়ায় গাজরের মূল বুড়ো আঙুলের চেয়ে বড় হয় না। তাই তারা গাজরের পাতার জন্যই এগুলো চাষ করে।
বাগানের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখে ওয়েন লিউয়ের মাথা ধরে গেল। ভূখণ্ডের অবস্থার উন্নতি করতে হলে চাষাবাদের পদ্ধতি বদলাতে হবে। নাহলে কঠোর পরিশ্রম করেও সবাই তিনবেলা পেট ভরে খেতে পারবে না। তবে আপাতত আজকের দুপুরের এবং রাতের খাবার জোগাড় করাই আসল কাজ।
গাজর এখনো বড় হয়নি, তাই সেগুলো উপড়ে ফেলার প্রশ্নই আসে না। বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়কের সাথে মিলে তিনি কেবল বাইরের দিকের পাতাগুলো ছিঁড়লেন, মাঝখানের কচি পাতাগুলো রেখে দিলেন যাতে গাছগুলো বড় হতে পারে। বাঁধাকপির ক্ষেত্রেও একই কাজ করলেন। যেগুলোর অবস্থা ভালো নয়, সেগুলো তুলে ফেলে বাকিগুলোর জন্য জায়গা করে দিলেন।
বাগানের আয়তন বেশ বড় হওয়ায় দুই ঝুড়ি সবজির পাতা পাওয়া গেল।
"প্রভু, এক বেলায় তো এত সবজি খাওয়া সম্ভব নয়," বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক পিঠের ব্যথায় হাত রেখে বললেন। তিনি একজন নিম্নপদস্থ ব্যারন, তাই এসব কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস তার নেই।
"সমস্যা নেই, ভূখণ্ডে তো অনেক মানুষ, নষ্ট হওয়ার ভয় নেই।" ওয়েন লিউ এত সবজি শুধু নিজের জন্য তোলেননি। দাসদের ওই কঙ্কালসার চেহারা তার সহ্য হচ্ছিল না। তারা এখন তার অধীনে, তাদের ভালো রাখা তার দায়িত্ব। যদিও দাসপ্রথা থেকে তিনি তাদের মুক্তি দিতে পারছেন না, কিন্তু মনে মনে তিনি তাদের দাস বলে ভাবেন না।
তত্ত্বাবধায়ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন, এই সবজিগুলো আসলে দাসদের জন্যই। রাজদরবার থেকে আসা এই রাজপুত্র কেন দাসদের প্রতি এতটা সদয়? শোনা যায়, তার নিজের মা-ও নাকি একসময় দাসী ছিলেন, তাই কি?
তত্ত্বাবধায়ক অবাক হয়ে দেখলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও ওয়েন লিউ দমে যাননি। প্রথম দিন থেকেই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। অন্যান্য অভিজাতরা যা ঘৃণা করেন, ওয়েন লিউ নিজেই তা করছেন।
সবজিগুলো রান্নাঘরে আনার পর ওয়েন লিউ দাসদের ডাকলেন সেগুলো ধোয়ার জন্য। ধোয়ার পর কুচি করে মাংস ও ময়দার সাথে মিশিয়ে মাংসের পিঠা তৈরি করা হলো। ময়দা কম থাকায় তাতে শুকনো ডালের গুঁড়োও মেশানো হলো। স্বাদ যেমনই হোক, ওয়েন লিউ চেয়েছিলেন যাতে সবাই অন্তত সামান্য হলেও পেট ভরে খেতে পারে।
ওয়েন লিউ নিজের জন্য আলাদা অংশ সরিয়ে রাখলেন, নাহলে বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক আবার নসিহত শুরু করবেন।
রাঁধুনি মাংস লবণ দিয়ে মাখিয়ে রেখে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু ওয়েন লিউ তা প্রত্যাখ্যান করলেন। রান্নাঘরে এসেই তিনি দেখেছিলেন সকালের ভাজা মাংস কোথা থেকে এসেছিল। দেয়ালে লবণ দিয়ে মাখানো এক টুকরো মাংস ঝোলানো ছিল, যাতে ছত্রাক ধরে গিয়েছিল। সেখান থেকেই রাঁধুনি বেছে বেছে মাংস কেটে মশলা মাখিয়ে ভাজা দিয়েছিল। এই দৃশ্য দেখার পর সেই মাংস খাওয়ার রুচি তার আর ছিল না।