ষষ্ঠ অধ্যায়: হাসিমুখের মানুষকে আঘাত করা যায় না

তাইগা আলট্রাম্যানের গল্প: আমার বন্ধনের মূল্য শূন্যে পৌঁছেছে ভগ্ন ডানায় বাতাসকে শাসন 1988শব্দ 2026-03-06 04:48:07

প্রায় দশটা বাজতে চলেছে, উজ্জ্বল রোদছায়া চারদিকে ছড়িয়ে আছে। আজকের ড্রেসিং বদলানো ও পরীক্ষার কাজ শেষ করার পর, ইউসুখি চিকিৎসকের সঙ্গে সহযোগিতা করে হাসপাতালের কক্ষ ছেড়ে বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারবে। চিকিৎসকও তাকে উঠে হেঁটে বেড়ানোর অনুমতি দিয়েছেন, শুধু সাবধান করে দিয়েছেন যেন নিজেকে বেশি চাপ না দেয়; ক্লান্তি অনুভব করলে দ্রুত বিছানায় ফিরে যেতে এবং শরীরে কোনো অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ইউসুখি বাচ্চাদের মতো বারবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, বোঝাতে চাইল সে খুবই ভদ্র, চিকিৎসকের নির্দেশ ভালোভাবে মেনে চলা একজন আদর্শ রোগী।

এখন গ্রীষ্মের শুরু, দুপুরের দিকে, গরমের আমেজ ভালোই জমে উঠেছে। শরীরের স্বাভাবিক তাগিদে ইউসুখি হাসপাতালের সামনের চত্বরে অবস্থিত চলমান এক চায়ের দোকানের দিকে এগিয়ে গেল, মিষ্টি ও ঠান্ডা কিছু পানীয় খেতে ইচ্ছে করছিল। দোকানের মালিক হাসিমুখে বলল, ‘‘আপনি কী পান করবেন? আজ আমাদের দোকানে অফার চলছে, দ্বিতীয় কাপ অর্ধেক দামে।’’

ইউসুখি একটু চিন্তিতভাবে থুতনি ছুঁয়ে ভাবল, গতকাল আয়ু সিনিয়রকে বুঝিয়ে ফেরত পাঠানোর পরে, সে সহকর্মীদের গ্রুপে সবাইকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দিয়েছে—গত কয়েকদিনের যত্ন ও দেখাশোনার জন্য ধন্যবাদ, তার শরীর এখন অনেকটা সুস্থ, আর কাউকে পালা করে রাত্রিযাপন করতে হবে না, সবাই বিশ্রাম নিক, সে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলে আবার সবাইকে খাওয়াতে নিয়ে যাবে।

অন্যান্যরাও দ্রুত তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছে। অর্থাৎ, আজ কেউ হয়তো তাকে দেখতে আসবে না। তাহলে দ্বিতীয় কাপ চা কিনলে সেটাও নিজেকেই খেতে হবে… তবু, রাতের জন্য রেখে দেওয়া যেতেই পারে।

এভাবে ভাবতে ভাবতে সে মাথা নাড়ল, কম চিনি দিয়ে মুক্তা-দুধ চা অর্ডার দিল এবং দু’কাপের দাম মিটিয়ে দিল। এরপর, সে এক হাতে ট্যাব ধরে খবর পড়তে পড়তে আরেক হাতে চা আসার অপেক্ষা করছিল, এমন সময় হঠাৎ পিঠ বেয়ে ঠান্ডা কাঁপুনি বয়ে গেল।

ইউসুখি পুরো শরীরে কেঁপে উঠল, পেছন থেকে ভেসে আসা শীতল অনুভূতিতে পুরো দেহ যেন জমে গেল। আচ্ছা, তাহলে আজও কেউ তাকে দেখতে এসেছে… এই ভাবনা মাথায় আসতেই সে খবর পড়া চালিয়ে গেল, আর আস্তে করে অবস্থান বদলে নব্বই ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়াল, মুখ ঘুরিয়ে চায়ের দোকানের কাউন্টারের দিকে, চোখের কোণ দিয়ে পাশের দিকে তাকাল, পেছনের অস্বস্তির উৎস বুঝতে চাইল।

বস্তুত, চোখের কোণে ধরা পড়া কালো-সাদা মেশানো লম্বা শার্টটিই যথেষ্ট ছিল। এই মুহূর্তে ‘‘ইউসুখি’’ কেবল প্রশংসা করল, কী অসাধারণ দক্ষতায় ‘রাউন্ড’ কাস্টিং করে। ওই ব্যক্তিটি অভিনেতা নানাসে কোউয়ের পুরোপুরি অনুরূপ নয়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব ও উপস্থিতি এতটাই স্বতন্ত্র যে, ‘টাইগা আল্ট্রাম্যান’ দেখেছেন এমন কেউই তাকে মুহুর্তেই চিনে নিতে পারবে—সে তো কিরিসাকি, অর্থাৎ সেই তোৰেকিয়া-র মানবরূপ।

সে যদি সেই বিখ্যাত কালো-সাদা শার্ট না-ও পরে, চুলে নীল রঙের আভাস না-ও থাকে, চোখের তলায় নীল ছায়া না-ও থাকে, তবু এক নজরেই চিনে ফেলা যায়।

এই সময়, দোকানের মালিক তৈরি করা দু’কাপ চা কাউন্টারে তুলে রাখলেন, প্যাকেট খুলে ব্যাগে ভরতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ইউসুখি তাকে থামিয়ে দিল।

‘‘এখনই খাচ্ছি, ব্যাগে দিতে হবে না, ধন্যবাদ।’’

দোকানদারও খুশি মনে একটি ব্যাগ বাঁচিয়ে নিলেন, পাশে রাখা প্লাস্টিক বাক্স থেকে দুইটি স্ট্র বের করলেন।

‘‘একটি খুলে দেব?’’

‘‘এক কাপ খুলে দিন।’’

তখন দোকানদার একটি স্ট্র চায়ের কাপের মুখে লাগিয়ে ইউসুখির হাতে দিলেন, আরেক কাপ চা ও স্ট্র কাগজের ট্রে-তে গুছিয়ে দিলেন।

ইউসুখি প্রথম কাপ চা হাতে নিয়ে, অনায়াসে দ্বিতীয় কাপ এবং স্ট্রটি পাশের ‘অচেনা’ লোকটির হাতে বাড়িয়ে দিল।

আসলে, হাত বাড়িয়ে অন্তত এক হাত দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছিল সেই বিপজ্জনক ব্যক্তির সঙ্গে।

আচ্ছা, এও তো কেবল মানসিক সান্ত্বনা; সে চাইলে, এক হাত দূরত্ব কোনো ব্যাপারই নয়—আটশো মাইল দূর থেকেও গুলি করে মেরে ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, তোৰেকিয়াও তার আচরণে খানিকটা হতচকিত—হঠাৎ চা ধরিয়ে দেওয়া হলো কেন? এই টাইগা-নির্বাচিত মানবদেহের কী সমস্যা?

যদিও কারণ বুঝে উঠতে পারল না, তবু তোৰেকিয়া ভদ্রতার হাসি ফুটিয়ে, দু’হাতে সেই চা গ্রহণ করল। উপহারদাতাকে কেউ কখনো অপমান করে না।

ইউসুখি ঐ চা বাড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তেই হঠাৎ দেখতে পেল, সামনের ব্যক্তির মাথার ওপর একটা বড় ‘‘+১’’ চিহ্ন ফুটে উঠল, সঙ্গে ছিল একগুচ্ছ আকারের আলো-রাজ্যের অজানা লিপি।

তোৰেকিয়াও লক্ষ্য করল ইউসুখির দৃষ্টি তার মাথার ওপরে গিয়ে স্থির হয়েছে, তারপর সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।

এখানে কী আছে? তোৰেকিয়া কৌতূহলী হয়ে উপরে তাকাল।

দৃষ্টিসীমায় ভেসে উঠল কেবল নীল, মেঘহীন আকাশ।

ওপাশের লোক যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, ইউসুখি চট করে হাতটা উঠিয়ে গোপনে কোমরের কাছে রাখা টাইগা-আলোক-কী স্পর্শ করল।

নিশ্চিতভাবেই, দৃশ্যমান আলোক-পর্দায় চারটি শূন্যের একটি ‘০’ এখন ‘১’ হয়ে গেছে।

যদিও বোঝা গেল না এই ‘+১’ কী বাড়ল, আর পেছনের আলো-রাজ্যের লিপি তো এক ঝলকে মিলিয়েও গেল, ইউসুখি তো এমনিতেই পড়ে না, দেখতে পেলও না—তবু আপাতত এটাকে ‘‘চূড়ান্ত পয়েন্ট’’ বলেই ভাবা যাক।

ওদিকে তোৰেকিয়া কিছুই দেখতে না পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। উপহার পেয়ে সে কৃতজ্ঞতা জানাতে যাচ্ছিল, কিন্তু দেখল ইউসুখি সামনে নেই।

সে তাকিয়ে দেখে ইউসুখি চায়ের দোকানের কাউন্টারের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, আরও এক কাপ চা অর্ডার করছে।

দোকানদার পুরো ঘটনাটা দেখে বিস্মিত, কিছুই বুঝতে পারছে না দুই অতিথির এই নীরব খেলা, তবু বিক্রি তো বিক্রিই, চটপট আরও এক কাপ চা বানিয়ে কাগজের ব্যাগে গুছিয়ে দিল।

এই কাপটা নিশ্চয়ই নিয়ে যাওয়া হবে?

ইউসুখি ফের ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যাগ হাতে নিয়ে এগিয়ে এল।

ফলে তোৰেকিয়া পেল দ্বিতীয় কাপ চা।

‘‘…………??’’